স্বৈরাচারের পূর্বাপর
খালিদ নিশাচর
“মাথা উচু করে বাঁচতে হলে মরতে জানতে হয়। বাঙ্গালী আজ মরতে ভুলে গেছে”– কোথাও এক কলামিস্টের লেখায় পড়েছিলাম এমন বাণী। সত্যি বলতে তখনকার সময়ে চারপাশে দৈনন্দিন ঘটে চলা অনাচার,স্বেচ্ছাচার দেখে আমারও এমনটাই মনে হচ্ছিল। ধর্ষক, খুনি, চাঁদাবাজরা কি অবলীলায় দলের নাম ভাঙ্গিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। শিক্ষা, সার্বভৌমত্য বলি দেয়া হচ্ছে গদি মজবুত করতে। প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলোকে চেপে ধরা হচ্ছে পৈশাচিক বর্বরতায়। গলা কেটে কিংবা পিটিয়ে চিরতরে স্তব্ধ করে দেয়া হচ্ছে প্রতিবাদীদের। আর সুবিধাবাদী, মুনাফালোভীরা দল ও বোল পাল্টে যখন ক্ষমতাবান,সৈরাচারদের পদলেহনে ব্যস্ত – তখন এমনটা মনে হওয়াই ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু এই জ্বাতী যে একদিন এভাবে ঘুমন্ত আগ্নেয়গিরি থেকে হঠাৎ উন্মত্ত হয়ে উঠা লাভার ন্যায় কিংবা ছাই থেকে জন্ম নেয়া ফিনিক্স পাখির ন্যায় জেগে উঠবে-তা কে ভেবেছে কবে?
আমেরিকান লেখক ‘জন রিড’ তার ‘বলশেভিক’ বিপ্লবের উপর লেখা বইয়ের নাম দিয়েছিলেন,” দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন।” আমাদের ৩৬ শে জুলাই তেমনই ‘দুনিয়া কাঁপানো ৩৬’ দিন। যেদিনগুলোতে এই বীর জ্বাতীর দিতীয় জন্ম ঘটেছে। আঠার কোটি জননীর বাংঙ্গালি করে রাখা সন্তানেরা মানুষ হয়ে উঠেছে। মুক্তিযুদ্ধের পর এই প্রথম ধর্ম,বর্ণ,পেশার ভেদাভেদ ভুলে জাতী কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছ। ভাই ভাইয়ের জন্য বুক পেতে দিয়েছে বুলেটের সামনে। ‘আমার ভাই কোন দোষ করে নাই’, ‘আমার সন্তানকে নিতে পারবেন না’-এমন সব রোদনভরা অথচ ইস্পাত-দৃঢ় বাক্যে সহপাঠীরা বোনের রুপে,শিক্ষিকাগণ মায়ের রুপ গর্জে উঠে ঢাল বনে গেছে। শিক্ষার্থী থেকে শ্রমিক, শ্রমজীবী থেকে আইনজীবী, রিক্সাচালক থেকে হকার মিলিমিশে একাকার হয়ে গেছে মিছিলের দীর্ঘ সারিতে।
একটা গণতান্ত্রিক উপায়ে শুরু হওয়া নিরীহ ছাত্র আন্দোলনে ‘বুলেট-রাঙ্গা’ ঘি ঢেলে উত্তপ্ত করা হল,তারপর সেই আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেল স্বৈরাচারের প্রসাদ—এমন অভাবনীয়, অবিস্মরণীয় রুপকথার জন্ম হয়েছে এই দিনে।
ইতিহাস এক অনবদ্য শিক্ষক। বারবার ফিরে ফিরে আসে। এর থেকে শিক্ষা নিয়ে শুধরে না গেলে, আঁস্তাকুড়ে ঠাঁই হয় নিন্দার স্রোতে ভেসে ভেসে।
এইতো বেশি দিন আগের কথা নয়,যেদিন প্রেসিডেন্ট এরশাদ সাহেব লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে করে ক্ষমতার চেয়ারে এসে বসলেন। নির্বাচনে কারচুপি করে ক্ষমতার গদি পোক্ত করতে না করতেই পেলেন স্বৈরাচারের তকমা। এবং বিরোধী আন্দোলনে মাত্র একজন ‘নূর হোসেন’ হত্যার দায়ে জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে পদত্যাগ করলেন।সে আন্দোলনে যারা সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল, তারাই পরবর্তীতে কি নিদারুণভাবে সেই ইতিহাস ভুলে হয়ে উঠলো হাজারো ‘নূর হোসেনের’ খুনি। এবং এরশাদের চেয়ে শত গুণ স্বৈরাচারী। আর পরিণতিও কারো অজানা নয়। মাথার উপরের ওই নির্বাক নীলাকাশ পৃথিবীর দেশে দেশে এমন অসংখ্য হাসিনা, ঈদি আমিন, মার্শাল টিটোর জুলুমের সাক্ষী।
“আমি ইতিহাস লিখি না, ইতিহাস তৈরি করি এবং আমিই নিজের ইচ্ছামত ইতিহাস পরিবর্তন করতে পারি” –এমন দাম্ভিক উক্তি করতেন প্যারাগুয়ের একনায়ক হোসে গ্যাসপার রদরিগেজ দে ফ্রান্সিয়া। যিনি নিজেকে ‘দ্যা সুপ্রিম’ হিসেবেও সম্বোধন করতেন। যেকোনো ধরনের প্রতিপক্ষকে নিশ্চিহ্ন করতে দমন, পীড়ন ও কয়েদ করার প্রবণতায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত কঠোর ও বদ্ধপরিকর।
‘ডমিনিকান রিপাবলিক’ এর নারীলিপ্সু ‘চিফ’ ‘রাফায়েল ত্রুহিয়ো’ এর শাসনের মূলনীতি ছিল একটি মাত্র। তা হল যার বা যাদের কাছ থেকে চূড়ান্ত পর্যায়ের আনুগত্য না পাওয়া যাবে,সামান্যতম অবাধ্যতার লক্ষণ ও যারা দেখাবে, তাদেরকেই হত্যা করা হবে। তিনি তার মন্ত্রীদের আনুগত্য পরীক্ষা করতেন তাদের স্ত্রীদের শয্যা-সঙ্গিনী হিসেবে ডেকে নিয়ে। তার শাসনামলে ৩০ হাজার মতান্তরে ৫০ হাজার মানুষকে তিনি হত্যা করেছিলেন তার পেটোয়া বাহিনী দিয়ে। নির্মম শোষণের মাধ্যমে ক্ষমতায় টিকে থাকা ‘দ্যা গোট’ খ্যাত এই স্বৈরাচারীর সাথেই বেশি মিল খুজে পাওয়া যায় আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রীর।
পিলখানা, শাপলা চত্বর, ২৪ শে জুলাই এর গণহত্যার কলঙ্ক ও দীর্ঘ ১৬ বছরের শাসন আমলের বিভিন্ন সময়ে গুম,খুনের দীর্ঘ ফিরিস্তি তারই প্রমাণ দেয়। তবে আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী স্বকীয়তা ছিল এই যে, তিনি ঠান্ডা মাথার এসব ভয়াবহ গণহত্যা করাতেন নিজ দলের ক্যাডারদের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশের গুন্ডাদের ভাড়া করে। তিনি মরিয়া হয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকতে গিয়ে সর্বশেষ যে গণহত্যা চালালেন তাতে পার্শ্ববর্তী দেশের আশি হাজার অনুপ্রবেশকারী খুনি নিয়োগ করেছিলেন বলে খবরে এসেছে। এখানে একটা বড় প্রশ্ন থেকে যায় যে, তিনি ক্ষমতা হারানোর পর সেই সব খুনিরা কিভাবে ও কাদের ছত্রছায়ায় দেশ থেকে নিরাপদে পালাতে পারল? বর্তমান ক্ষমতাসীনগণ ও সাবেক উপদেষ্টারা কেউই এই প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারেন না।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা না নিলে জুলুম ও জালেমদের পরিণামেরই যে পৌণপুনিক পুনরাবৃত্তি ঘটতে থাকবে তা বলাই বাহুল্য। সুতরাং কথা আর না বাড়িয়ে এই ধারাবাহিকতায় এবং দেশের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে লেখক ও ভাষাবিদ ডঃ হুমায়ুন আজাদের একটা উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করতে চাই। তিনি বলতেন, “বিপ্লবীদের বেশিদিন ক্ষমতায় থাকতে নেই। বেশিদিন ক্ষমতায় থাকলে তারা প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে ওঠে। “আমিও এমনটাই বিশ্বাস করি। কারণ অতীত নিকটে চীনের মাও সেতুং এবং আমাদের দেশের স্থপতি হিসেবে খ্যাত যিনি, তাদের বিপ্লব পরবর্তী কর্মকান্ড ও পরিণতি আমরা সকলেই জানি। এবং বিশ্ব-ইতিহাসের পাতা রয়েছে এমন আরো অসংখ্য উপখ্যান।