প্রিয় পাঠক

আস্সালামু আলাইকুম, সবাই কেমন আছেন, আশা করি সকলে ভালো আছেন। একসময় মানুষের আবেগ, ভালোবাসা, মায়া, অভিমান আর প্রতীক্ষার আরেক নাম ছিল—চিঠি। সাদা পাতার উপর ছড়িয়ে পড়া নীল কিংবা কালো কালির অক্ষরগুলো যেন প্রিয় মানুষের হাতের স্পর্শ, হৃদয়ের নিঃশব্দ ধ্বনি আর অশ্রুজলের নীরব সাক্ষী হয়ে ফুটে উঠত। একটি খাম, তার গায়ে লেগে থাকা ডাকটিকিট—এসবই ছিল এক একটি অমূল্য স্মৃতি বহন করার মাধ্যম।

আজ যখন বাংলার দিগন্ত সাহিত্য পরিবার মাসিক ম্যাগাজিন’কে স্মরণ করি, তখন অনিবার্যভাবে বুকের গভীরে এক অব্যক্ত ব্যথা জেগে ওঠে, এক মায়াবী সময়ের জন্য মন কেঁদে ওঠে, যখন চিঠি ছিল হৃদয়ের সঙ্গে হৃদয়ের সংযোগের এক অনন্য সেতু।

চিঠি ছিল অপেক্ষার এক মধুরতম শিল্প। ডাকপিয়নের সাইকেলের ঘণ্টার সেই মায়াবী শব্দ অথবা কাঁধে ঝোলানো ব্যাগের হালকা ঝনঝন শব্দ মানেই ছিল বুকের ভেতর এক তীব্র আলোড়ন। হয়ত দূর সমুদ্রপাড় থেকে আসা খামের ভেতরে জমা ছিল প্রবাসীর কণ্ঠস্বরহীন কিন্তু হৃদয়স্পর্শী ভাষা। হয়তো গ্রামের মাটির সোঁদা গন্ধ মিশে যেত চিঠির পাতায়, যে চিঠি শহরে থাকা সন্তানের কাছে পৌঁছে দিত মায়ের দোয়া আর মমতার সুগন্ধ। আবার প্রেমপত্রের ভাঁজে ভাঁজে জমে থাকত লাজুক হৃদয়ের উচ্ছ্বাস, কাগজের প্রতিটি অক্ষরে লুকানো থাকত অনন্ত স্বপ্ন আর প্রতিশ্রুতির রঙ।

চিঠির সেই ভালোবাসা শুধু দিনেই নয়, রাত জেগেও লেখা হতো। হারিকেন বা কেরোসিন বাতির মৃদু আলোয় একেকটি প্রেমপত্র রচিত হতো গভীর আবেগে। শব্দ বেছে নিতে হতো সময় নিয়ে, একেকটি বাক্যে মিশে যেত হৃদয়ের অস্থিরতা। অক্ষরের আড়ালে চাপা থাকত অভিমান, প্রকাশ পেতো লুকানো স্বপ্ন। এই চিঠি লেখার জন্য বাজারে পাওয়া যেত নানা রঙের, নানা ডিজাইনের প্যাড। সাদা, নীল, গোলাপি কিংবা ফুলেল নকশার কাগজে লেখা হতো সেই চিঠি। সাথে থাকত খাম—সাদা, বাদামি কিংবা রঙিন, যা বহন করত ব্যক্তিত্বের ছাপ। অনেক সময় প্রেমপত্রে রাখা হতো শুকনো গোলাপফুল, কিংবা বকুল ফুলের মালা—যেন অক্ষরের সঙ্গে মিলেমিশে সুবাসও পৌঁছে যায় প্রিয়জনের কাছে। আসলে তখন প্রেমের প্রস্তাবই প্রথম জানানো হতো একটি চিঠির মাধ্যমেই।

তবুও চিঠির আবেদন মুছে যায়নি। সাহিত্যে, সংগীতে, চলচ্চিত্রে—চিঠি আজও এক চিরন্তন প্রতীক হয়ে বেঁচে আছে। মোঃ নাসির উদ্দিন (ভূঁইয়া) সম্পাদিত বাংলার দিগন্ত সাহিত্য পরিবার মাসিক ম্যাগাজিন কেবল ব্যক্তিগত আবেগেরই দলিল নয়, বরং বাংলার প্রকৃতি, সমাজ ও মানুষের অন্তর্জগতের এক অমূল্য নথি।

কবিতাতেও চিঠি এক চিরন্তন অনুষঙ্গ। “পত্র দিও” —এই ছোট্ট অনুরোধই হয়ে উঠেছে বাংলা কাব্যের এক গভীর আকুতি, যেখানে বিরহিনী নারী তার প্রিয়জনকে একখানা পত্র পাঠাতে আহ্বান জানায়। কবিরা বারবার চিঠিকে ব্যবহার করেছেন বিরহ, প্রতীক্ষা আর প্রেমের প্রতীক হিসেবে। অক্ষরের ভাঁজে জমে থাকা অশ্রুবিন্দু যেমন হয়ে উঠেছে কবিতার অলঙ্কার, তেমনি চিঠির পাতায় লেখা স্বপ্ন হয়ে উঠেছে চিরন্তন ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি।

এই দিনে যদি আমরা আবার কাগজ-কলম হাতে নিই, যদি আবার প্রিয়জনকে একখানা চিঠি লিখি—তাহলে হয়তো আমরা ফিরে পাবো সেই হারানো মায়া। পৃথিবী আবার শোনাবে সেই অনন্ত প্রতীক্ষার সুর, সেই ডাকপিয়নের ঘণ্টার শব্দে জেগে উঠবে স্মৃতির আলোড়ন। চিঠি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়, এটি এখনো হৃদয়ের সবচেয়ে নরম আশ্রয়। ডিজিটাল যুগেও বিশ্ব চিঠি দিবস আমাদের কণ্ঠে সেই অমলিন প্রতিজ্ঞা নিয়ে আসুক—আমরা লিখব, বাংলার দিগন্ত সাহিত্য পরিবার ম্যাগাজিনে, আমরা পৌঁছে দেব হৃদয়ের বার্তা কাগজের বুকে, সময়ের ভাঁজে রেখে যাব অক্ষরের মতো অমর ভালোবাসা।