বেইলি ব্রিজে বালির বস্তার তালি, নির্মাণাধীন সেতু পার হতে হয় মই বেয়ে!
দ্বীপ চন্দ্র সরকার
বার্তা সম্পাদক
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ): ময়মনসিংহের ত্রিশাল ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী খিরু নদীর ওপর একটি সেতুর অভাবে চরম দুর্ভোগ ও জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন দুই অঞ্চলের লাখো মানুষ। জমি অধিগ্রহণের জটিলতায় দীর্ঘ দেড় বছর ধরে বন্ধ রয়েছে নতুন সেতুর নির্মাণকাজ, আর পুরোনো ঐতিহ্যবাহী বেইলি ব্রিজটি এখন কোনোমতে টিকিয়ে রাখা হয়েছে বালির বস্তার জোড়াতালিতে। ফলে প্রতিদিন যাতায়াত করতে গিয়ে চরম আতঙ্কের মুখে পড়ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সরেজমিনে পোড়াবাড়ী বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, খিরু নদীর ওপর ১৯৮০-এর দশকে নির্মিত পুরোনো বেইলি ব্রিজটির বিভিন্ন স্থানের পাটাতন সরে গেছে এবং অনেক অংশ ভেঙে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দীর্ঘদিন কোনো সংস্কার না হওয়ায় স্থানীয়রা বাধ্য হয়ে নিজেদের উদ্যোগে ভেঙে যাওয়া জায়গাগুলোতে বালিভর্তি প্লাস্টিকের বস্তা বসিয়ে চলাচলের ব্যবস্থা করেছেন। পুরো ব্রিজজুড়ে এমন প্রায় শতাধিক বস্তা ব্যবহার করা হলেও যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। এই মরণফাঁদ এড়াতে অনেক পথচারী, বিশেষ করে শিশু, শিক্ষার্থী ও বয়স্করা পাশের নির্মাণাধীন নতুন সেতুর একপাশে কাঠের তৈরি অস্থায়ী মই বেয়ে ঝুঁকি নিয়ে পারাপার হচ্ছেন। এতে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, কৃষক ও স্কুল-কলেজগামী শিক্ষার্থীরা।
স্থানীয় বাসিন্দা আবুল মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, দুই উপজেলার লাখ লাখ মানুষের যাতায়াতের একমাত্র ভরসা এই পথটি। শত শত ভাঙা জায়গায় প্লাস্টিকের বালির বস্তা দিয়ে মানুষ চলাচল করছে। দুর্ঘটনার ভয়ে অনেকে পাশের অসমাপ্ত নতুন সেতুতে কাঠের মই লাগিয়ে পারাপার হচ্ছে। দ্রুত নতুন সেতুর কাজ শেষ করে চালু না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। পোড়াবাড়ী উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী দিপু দাশ বলে, বেইলি সেতুতে উঠতে প্রচণ্ড ভয় হয়। মনে হয় এই বুঝি সেতুসহ নিচে পড়ে যাব। তবুও আতঙ্ক নিয়ে নিয়মিত আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে। বিকল্প পথে যাতায়াত করতে গেলে অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হয়, যাতে সময় এবং টাকা দুই-ই বেশি লাগে বলে জানান রাণীগঞ্জ পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি রুবায়েত হোসেন।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) সূত্রে জানা গেছে, বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২২ সালে ৭০ মিটার দৈর্ঘ্যের এই নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয়। এমসিই-এমএলএম (জেভি) নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রকল্পটির কাজ পায়। ২০২৩ সালের আগস্টে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় তা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে প্রায় সাড়ে ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণ নিয়ে জটিলতা রয়েছে, যার মালিক ও ওয়ারিশ মিলিয়ে রয়েছেন প্রায় ২০ থেকে ২২ জন। জমির অন্যতম মালিক বাসন্তী রানী চৌধুরী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, জমি অধিগ্রহণে তাঁর তিন শতকের ভিটে পড়েছে কিন্তু এখনও কোনো টাকা পাননি। টাকা না পাওয়া পর্যন্ত তাঁরা জমির দখল ছাড়বেন না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপক মকবুল হোসেন বলেন, প্রায় ১৯ শতাংশ জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া শেষ হলে অতি দ্রুতই সংযোগ সড়ক তৈরি করে কাজ সম্পন্ন করা যাবে। এ বিষয়ে ত্রিশাল উপজেলা প্রকৌশলী যুবায়েত হোসেন বলেন, নতুন সেতুর মূল অবকাঠামো নির্মাণকাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। এখন সংযোগ সড়কের মাটি ভরাটের কাজ করার কথা থাকলেও জমির মালিকদের বাধার কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তারা ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধ না হওয়া পর্যন্ত কাজ করতে দিচ্ছেন না। জমি, স্থাপনা ও গাছপালার মূল্য নির্ধারণ করে অধিগ্রহণের প্রস্তাব ইতোমধ্যে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিপূরণের অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই অবশিষ্ট কাজ শেষ করে নতুন সেতুটি যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।